logo

তামাত্তু হজ আদায় করবেন যেভাবে

তামাত্তু হজ আদায় করবেন যেভাবে
হজ পালন করার সময় আরাফার ময়দানে অবস্থান করা ফরজ। ছবি: সংগৃহীত

আর্থিক ও দৈহিকভাবে সামর্থ্যবান মুসলমানের ওপর জীবনে একবার হজ করা ফরজ। আল্লাহ বলেন, ‘প্রত্যেক সামর্থ্যবান মানুষের ওপর আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য কাবাঘরের হজ করা ফরজ।’ (সুরা আলে ইমরান, আয়াত: ৯৭)। হজ তিন প্রকার। যথা—ইফরাদ, কিরান ও তামাত্তু। প্রায় হাজি তামাত্তু হজ পালন করেন। এটি পালন করা সুবিধাজনক। এতে কষ্টও কম হয়। এক ইহরাম পরিধান করে ওমরা শেষ করে আলাদা ইহরামে হজ করা হলো তামাত্তু। এখানে তামাত্তু হজ পালনের ধারাবাহিক পদ্ধতি তুলে ধরা হলো—

১. ওমরাহর ইহরাম (ফরজ)

ইহরামের কাপড় পরার আগে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা সেরে ফেলতে হবে। এরপর অজু-গোসল করতে হবে। সরাসরি মক্কায় গেলে পুরুষরা ঘর বা হজক্যাম্প থেকে সেলাইবিহীন একটি সাদা কাপড় পরুন। অন্যটি গায়ে জড়িয়ে নিন। নারীরা ইহরামের পোশাক পরে নিন। ইহরামের নিয়তে দুই রাকাত নামাজ আদায় করুন। শুধু ওমরাহর নিয়ত করে এক বা তিনবার তালবিয়া পাঠ করুন। তালবিয়া হলো—উচ্চারণ: লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক, লাব্বাইকা লা শারিকা লাকা লাব্বাইক, ইন্নাল হামদা, ওয়ান নিমাতা, লাকা ওয়াল মুলক, লা শারিকা লাক।

২. ওমরাহর তাওয়াফ (ওয়াজিব)

অজু অবস্থায় ইজতিবাসহ সাতবার কাবাঘর তাওয়াফ করুন। ইজতিবা হলো ইহরামের চাদরকে ডান বগলের নিচে রেখে চাদরের দুই মাথাকে বাম কাঁধের সামনে ও পেছনে ফেলে রাখা। হাজরে আসওয়াদ সামনে রেখে তার বরবার ডান পাশে দাঁড়িয়ে ‘বিসমিল্লাহি আল্লাহু আকবার’ বলে দুই হাত কাঁধ পর্যন্ত উঠিয়ে তাওয়াফ শুরু করুন। সম্ভব হলে হাজরে আসওয়াদে চুমু দিন বা স্পর্শ করুন। রুকনে ইয়ামেনি হাত দিয়ে স্পর্শের চেষ্টা করুন। ঝামেলা হলে প্রয়োজন নেই। রুকনে ইয়ামানি থেকে হাজরে আসওয়াদের মাঝখানে ‘রাব্বানা আতিনা ফিদ দুনয়া হাসানাতাও ওয়া ফিল আখিরাতি হাসানা, ওয়া কিনা আজাবান নার, ওয়াদ খিলনাল জান্নাতা মাআল আবরার, ইয়া আজিজু ইয়া গাফফার, ইয়া রাব্বাল আলামিন’ দোয়াটি পড়ুন। হাজরে আসওয়াদ পর্যন্ত এসে চক্কর পুরো করুন। এরপর হাজরে আসওয়াদ বরাবর দাঁড়িয়ে হাত দিয়ে ইশারা করে দ্বিতীয় চক্কর শুরু করুন। এভাবে সাত চক্করে তাওয়াফ শেষ করুন। প্রথম তিন চক্করের সময় পুরুষের জন্য রমল করা সুন্নত। রমল হলো দ্রুতগতিতে বীরদর্পে ঘন ঘন পায়ে চলা। পরের চার চক্কর সাধারণভাবে হেঁটে তাওয়াফ করতে হবে।

৩. দুই রাকাত নামাজ (ওয়াজিব)

তাওয়াফ শেষে মাকামে ইবরাহিমের পেছনে বা হারাম শরিফের যে কোনো জায়গায় (মাকরুহ সময় ছাড়া) দুই রাকাত নামাজ পড়ুন। এটি দোয়া কবুলের জায়গা। নামাজ শেষে দাঁড়িয়ে জমজমের পানি পান করুন।

৪. সাঈ করা (ওয়াজিব)

সাফা পাহাড়ের ওপরে উঠে কিবলামুখী হয়ে সাঈর নিয়ত করে হাত তুলে তিন বার তাকবির বলে দোয়া করুন। এরপর সাঈ শুরু করতে হবে। সাফা থেকে মারওয়ার দিকে রওনা হয়ে দুই সবুজ দাগের জায়গাটি দ্রুত অতিক্রম করতে হবে। এভাবে এক চক্কর পূর্ণ হয়। মারওয়া পাহাড়ে ওঠার আগে দোয়া পড়তে হবে। পাহাড়ের ওপরে উঠে কিবলামুখী হয়ে হাত তুলে দোয়া করতে হবে। এবার সাফায় আসুন। এভাবে সাত চক্কর দিলে একটি সাঈ পূর্ণ হয়। সপ্তম চক্কর মারওয়ায় গিয়ে শেষ হবে।

মক্কার কাবাঘর ঘিরে নামাজ পড়ছেন হাজিরা। ছবি: সংগৃহীত
মক্কার কাবাঘর ঘিরে নামাজ পড়ছেন হাজিরা। ছবি: সংগৃহীত

৫. হলক করা (ওয়াজিব)

পুরুষদের মাথা মুণ্ডন করতে হবে। চাইলে চুল ছাঁটাও যাবে। হজরত মুহাম্মদ (সা.) মাথা মুণ্ডন করতেন। নারীদের চুলের এক ইঞ্চি কাটতে হবে। এতে ওমরাহর কাজ শেষ হবে। এরপর হজের ইহরাম বাঁধার আগ পর্যন্ত স্বাভাবিক হালাল সব কাজ করা যাবে।

৬. হজের ইহরাম (ফরজ)

হারাম শরিফের যে কোনো জায়গা বা নিজ বাসা থেকে আগের নিয়মে শুধু হজের নিয়তে ইহরাম বাঁধুন। এরপর ৮ জিলহজ জোহরের আগে মিনায় পৌঁছে যান।

৭. মিনায় অবস্থান (সুন্নত)

৮ জিলহজ জোহর থেকে ৯ জিলহজ ফজর পর্যন্ত পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ মিনায় আদায় করুন। মিনায় নামাজ আদায়ের পাশাপাশি সেখানে অবস্থান করতে হবে।

৮. আরাফার ময়দানে অবস্থান (ফরজ)

৯ জিলহজ সূর্য হেলার পর থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত আরাফার ময়দানে অবস্থান করা ফরজ। এখানে মনোযোগসহকারে হজের খুতবা শুনতে হবে। তাঁবুতে অবস্থানকারীরা জোহর ও আসর নামাজ মুকিম হলে চার রাকাত এবং মুসাফির হলে দুই রাকাত করে আদায় করুন। মসজিদে নামিরায় উভয় নামাজ জামাতে পড়লে একসঙ্গে আদায় করুন। সূর্যাস্তের পর মাগরিব না পড়েই মুজদালিফার দিকে রওনা হতে হবে।

৯. মুজদালিফায় অবস্থান (ওয়াজিব)

আরাফা থেকে সূর্যাস্তের পর মুজদালিফায় গিয়ে এশার সময় মাগরিব ও এশা এক আজানে ও এক ইকামতে একসঙ্গে আদায় করতে হবে। (মাগরিবের ওয়াক্ত চলে গেলেও, রাত গভীর হলেও মুজদালিফায় পৌঁছেই মাগরিব ও এশা পড়তে হবে)। মুজদালিফায় রাত যাপন করতে হবে। এখানে রাত যাপন সুন্নত। ১০ জিলহজ ফজরের নামাজের পর সূর্যোদয়ের আগে কিছু সময় মুজদালিফায় অবস্থান করা ওয়াজিব। সূর্য ওঠার আগে মুজদালিফা থেকে মিনার দিকে রওনা করুন। সম্ভব হলে রাতে ৭০টি ছোট পাথর সংগ্রহ করুন। চাইলে মিনায় যাওয়ার পথেও সংগ্রহ করা যাবেন।

আরাফা থেকে সূর্যাস্তের পর মুজদালিফায় যেতে হয়। ছবি: সংগৃহীত
আরাফা থেকে সূর্যাস্তের পর মুজদালিফায় যেতে হয়। ছবি: সংগৃহীত

১০. পাথর মারা (১০ জিলহজ, ওয়াজিব)

মিনায় পৌঁছে বড় জামারাকে (বড় শয়তান) সাতটি পাথর নিক্ষেপ করতে হবে। এটি ওয়াজিব। ১০ তারিখ সুবহে সাদিকের পর থেকে পর দিন সুবহে সাদিকের আগে যে কোনো সময় পাথর নিক্ষেপ করা যাবে। দুর্বল ও নারীরা চাইলে রাতে করতে পারবেন।

১১. কোরবানি করা (ওয়াজিব)

১০ জিলহজ পাথর নিক্ষেপের পরই কোরবানি করতে হবে। কোরবানির পর মাথা মুণ্ডন বা মাথার চুল ছাঁটতে হবে। এটি করা ওয়াজিব। নারীদের এক ইঞ্চি পরিমাণ কাটতে হবে। পাথর মারা, কোরবানি করা ও চুল কাটার মধ্যে ধারাবাহিকতা রক্ষা করতে হবে। ব্যতিক্রম হলে দম বা কোরবানি দিতে হবে।

১২. তাওয়াফে জিয়ারত (ফরজ)

১২ জিলহজ সূর্যাস্তের আগেই কাবাঘর জিয়ারত করতে হবে। ১২ তারিখের পর জিয়ারত করলে দম বা কোরবানি দিতে হবে। নারীরা ঋতুস্রাবের কারণে করতে না পারলে পবিত্র হওয়ার পর করতে হবে।

১৩. সাঈ (ওয়াজিব)

তাওয়াফ শেষে সাফা-মারওয়ায় গিয়ে সাঈ করতে হবে। সাফা থেকে শুরু হয়ে মারওয়ায় গিয়ে সাঈ শেষ হয়। সাফার ওপরে উঠে কিবলামুখী হয়ে সাঈর নিয়ত করে সাঈ শুরু করতে হবে। সাফা থেকে মারওয়ার দিকে রওনা হয়ে দুই সবুজ দাগের জায়গাটি দ্রুত অতিক্রম করতে হবে। এভাবে এক চক্কর পূর্ণ হয়। মারওয়া পাহাড়ে ওঠার আগে দোয়া পড়তে হবে। পাহাড়ের ওপরে উঠে কিবলামুখী হয়ে হাত তুলে দোয়া করতে হবে। এবার সাফায় আসুন। এভাবে সাত চক্কর দিলে একটি সাঈ পূর্ণ হয়। সপ্তম চক্কর মারওয়ায় গিয়ে শেষ হবে।

দুর্বল ও বয়স্ক হাজিদের জন্য বিশেষ হুইলচেয়ারের ব্যবস্থা রেখেছে সৌদি কর্তৃপক্ষ। ছবি: সংগৃহীত
দুর্বল ও বয়স্ক হাজিদের জন্য বিশেষ হুইলচেয়ারের ব্যবস্থা রেখেছে সৌদি কর্তৃপক্ষ। ছবি: সংগৃহীত

১৪. পাথর নিক্ষেপ (ওয়াজিব)

১১ ও ১২ জিলহজ প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় জামারায় (ছোট, মধ্যম ও বড় শয়তান) সাতটি করে ২১টি পাথর নিক্ষেপ করতে হবে। এটি করা ওয়াজিব। ছোট জামারা থেকৈ শুরু করে বড় জামারায় তা শেষ করতে হবে। এ দু দিন দুপুর থেকে পাথর নিক্ষেপের সময় শুরু। পর দিন সুবহে সাদিকের আগ পর্যন্ত যে কোনো সময় পাথর নিক্ষেপ করা যাবে। সূর্যাস্তের আগে পাথর মারতে পারলে ভালো। রাতেও করা যাবে। দুর্বল ও নারীরা সুবিধা মতো সময়ে মারতে পারবেন।

১৫. মিনায় রাত যাপন ও মিনা ত্যাগ

১০-১১ জিলহজ মিনাতেই রাত যাপন করতে হবে। ১৩ জিলহজ মিনায় না থাকতে চাইলে ১২ জিলহজ সন্ধ্যার আগে মিনা ছাড়ুন। ১৩ তারিখ সুবহে সাদিকের পর মিনায় অবস্থান করলে তার জন্য ১৩ তারিখের পাথর মারা সুন্নত। ১২ তারিখের পর একজন হজ পালনকারী সম্পূর্ণ স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারবেন।

১৬. বিদায়ী তাওয়াফ (ওয়াজিব)

হজযাত্রীদের জন্য বিদায়ী তাওয়াফ করা ওয়াজিব। বাংলাদেশি হজযাত্রীদের হজ শেষে বিদায়ী তাওয়াফ করা ওয়াজিব। তবে হজ শেষে যে কোনো নফল তাওয়াফই বিদায়ী তাওয়াফ হয়ে যায়।