logo

ময়মনসিংহ/ছয় মাস চলে বাণিজ্য, বাকি সময় অলস দুই স্থলবন্দর

ছয় মাস চলে বাণিজ্য, বাকি সময় অলস দুই স্থলবন্দর
ময়মনসিংহের হালুয়াঘাটে অবস্থিত গোবরাকুড়া-কড়ইতলী স্থলবন্দর। ছবি : এশিয়া পোস্ট

ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট উপজেলা সদর থেকে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার দূরে গোবরাকুড়া স্থলবন্দর। এর এক কিলোমিটার পশ্চিমে কড়ইতলী স্থলবন্দর। সীমান্তের এই দুই বন্দরে ঢুকলেই চোখে পড়ে কয়লার বড় বড় স্তূপ। তবে সেসব স্তূপের পাশে নেই শ্রমিকদের ব্যস্ততা, নেই ট্রাকের সারি, নেই ব্যবসায়ীদের হাঁকডাক। অনেক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের দরজায় ঝুলছে তালা।

কয়লা আমদানির মৌসুম শেষ হলেই যেন থেমে যায় পুরো বন্দর এলাকা। বছরে চার থেকে সর্বোচ্চ ছয় মাস ভারত থেকে কয়লা আমদানি হয়। বাকি সময় বন্ধ থাকে আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম। অথচ এই দুই স্থলবন্দরকে পূর্ণাঙ্গ বন্দর হিসেবে গড়ে তুলতে ইতিমধ্যে বিপুল অর্থ ব্যয় করেছে সরকার। নির্মাণ করা হয়েছে অবকাঠামো, অধিগ্রহণ করা হয়েছে জমি, ব্যবসায়ীদের জন্যও রাখা হয়েছে বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা। কিন্তু সারা বছর বাণিজ্যিক কার্যক্রম চালু না থাকায় অবকাঠামোর বড় অংশই পড়ে থাকে অব্যবহৃত অবস্থায়।

এর সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ছে বন্দরের শ্রমিকদের ওপর। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের হিসাবে, দুই বন্দরকে কেন্দ্র করে প্রায় ছয় হাজার শ্রমিক কাজ করেন। তাদের বড় একটি অংশ বছরের বেশির ভাগ সময় কর্মহীন থাকেন।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, ১৯৭৯ সালে কড়ইতলী এবং ১৯৯৭ সালে গোবরাকুড়া শুল্ক স্টেশনের মাধ্যমে ভারত থেকে কয়লা আমদানি শুরু হয়। পরে ২০১২ সালে সরকার এই দুটি শুল্ক স্টেশনকে পূর্ণাঙ্গ স্থলবন্দরে উন্নীত করার ঘোষণা দেয়। নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে প্রায় ৬৭ কোটি ২২ লাখ টাকা ব্যয়ে এ জন্য প্রকল্প নেওয়া হয়। ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশ স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষ নির্মাণকাজ শুরু করে। দুই বন্দরের জন্য অধিগ্রহণ করা হয় ৩২ একর জমি।

পূর্ণাঙ্গ বন্দর গড়ে তোলার উদ্দেশ্য ছিল শুধু কয়লা আমদানি নয়, ভারত ও ভুটানের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য বাড়ানো। কিন্তু বাস্তবে দুই বন্দরের বাণিজ্য এখনো মূলত কয়লানির্ভর। সেই কয়লার বাজারও সীমিত।

দুই বন্দরের ইতিহাস বলছে, স্থায়ী বাণিজ্যিক কার্যক্রম গড়ে তোলা সহজ হয়নি। ২০১৪ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত একটি মামলার কারণে দীর্ঘ সময় কয়লা আমদানি বন্ধ ছিল। আদালতের নির্দেশনার পর কখনো আমদানি শুরু হয়েছে, আবার কিছুদিন পর বন্ধ হয়েছে। এভাবে প্রায় আট বছর অনিশ্চয়তার মধ্যে ছিলেন ব্যবসায়ীরা।

গোবরাকুড়া ও কড়ইতলী স্থলবন্দর এলাকায় পড়ে থাকা কয়লার স্তূপ। ছবি : এশিয়া পোস্ট
গোবরাকুড়া ও কড়ইতলী স্থলবন্দর এলাকায় পড়ে থাকা কয়লার স্তূপ। ছবি : এশিয়া পোস্ট

২০২৩ সালের জানুয়ারিতে পরীক্ষামূলকভাবে কার্যক্রম শুরু হলেও কিছুদিন পর আবার কয়লা আমদানি বন্ধ হয়ে যায়। এক বছর পর, ২০২৪ সালের ৪ এপ্রিল, দুই বন্দর দিয়ে ভারতীয় কয়লা আমদানি আবার উদ্বোধন করা হয়। এরপরও আমদানি নিয়মিত হয়নি।

ফলে কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে অবকাঠামো নির্মাণের পরও গোবরাকুড়া ও কড়ইতলী এখনো পূর্ণাঙ্গ বাণিজ্যকেন্দ্র হয়ে উঠতে পারেনি। বরং কয়লার মৌসুমে কয়েক মাসের জন্য প্রাণ ফিরে পাওয়া এবং পরে আবার দীর্ঘ নীরবতায় ডুবে যাওয়াই হয়ে উঠেছে দুই বন্দরের বাস্তবতা। বন্দর এলাকায় পড়ে থাকা কয়লার স্তূপগুলো যেন সেই বাস্তবতারই প্রতিচ্ছবি। পণ্য থাকলে বাড়ে শ্রমিকদের ব্যস্ততা, খোলে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, বাড়ে ট্রাকের চলাচল। পণ্য না থাকলে একই এলাকায় নেমে আসে নীরবতা।

বন্দর কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, ভারত থেকে বীজ, গম, ছোট-বড় পাথর, কয়লা, রাসায়নিক সার, চায়না ক্লে, কাঠ, টিম্বার, চুনাপাথর, পেঁয়াজ, মরিচ, রসুন, আদা, বলক্লে, কোয়ার্টজ, ফুলঝাড়ু, ডাব, হলুদ, কাজুবাদাম, তেঁতুল, তিল, সরিষার ভূষি ও চালের কুঁড়া আমদানির সুযোগ রয়েছে। বাংলাদেশ থেকে অনুমোদিত যেকোনো পণ্য রপ্তানির সুযোগও রয়েছে। তবে বাস্তবে এসব পণ্যের নিয়মিত আমদানি-রপ্তানি হচ্ছে না। ফলে সীমিত হয়ে আছে বন্দর দুটির বাণিজ্যিক সম্ভাবনা।

বন্দরে কাজ করেন আব্দুল বাসির। তার ভাষ্য, কয়লার ট্রাক এলে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত কাজ থাকে। কখনো কয়লা নামানো, কখনো ট্রাকে তোলা দিনভর ব্যস্ততা। তখন আয়ও হয়। কিন্তু আমদানি বন্ধ হলে কয়েক দিন অপেক্ষা করার পর অন্য কাজের সন্ধানে যেতে হয় তাকে।

আব্দুল বাসির বলেন, বন্দরটা যখন চলে, তখন মনে হয় আমাদেরও একটা নিয়মিত কাজ আছে। কিন্তু কয়েক মাস পর আবার সব থেমে যায়। তখন সংসার চালানোই কঠিন হয়ে পড়ে।

জয়নাল নামের আরেক শ্রমিক জানান, বন্দরের কাজের সঙ্গে শুধু তারা নন, স্থানীয় দোকানদার, চা বিক্রেতা ও ট্রাকশ্রমিকসহ অনেক মানুষ যুক্ত। বন্দর বন্ধ থাকলে তাদের সবার আয় কমে যায়। কয়লা আসার সময় পুরো এলাকায় মানুষের আনাগোনা বাড়ে। আমদানি বন্ধ হলে দোকানেও ক্রেতা থাকে না।

ফরিদ মিয়া নামের আরেক শ্রমিক বলেন, আমরা চাই বন্দরটা শুধু কয়েক মাসের জন্য না, সারা বছর চলুক। কয়লা না থাকলেও অন্য পণ্য এলে আমাদের কাজ থাকবে। তখন এলাকার মানুষও উপকৃত হবে।

স্থানীয়দের প্রত্যাশা, অনুমোদিত বিভিন্ন পণ্যের আমদানি-রপ্তানি বাড়িয়ে দুই বন্দরের কার্যক্রম সারা বছর সচল করা হোক। এতে একদিকে ব্যবসার পরিধি বাড়বে, অন্যদিকে বন্দরের সঙ্গে যুক্ত হাজারো শ্রমিকের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে। পাশাপাশি পূর্ণাঙ্গ স্থলবন্দর হিসেবে গড়ে তুলতে যে অর্থ ব্যয় হয়েছে, তার সুফলও পাওয়া যাবে।

গোবরাকুড়া স্থলবন্দরে প্রায় ৩৫০ জন এবং কড়ইতলী স্থলবন্দরে ২৫০ জন ব্যবসায়ী রয়েছেন। ব্যবসায়ীদের অনেকের মতে, শুধু কয়লার ওপর নির্ভর করে ব্যবসা চালানো কঠিন। কারণ, কয়লার চাহিদা মূলত ইটভাটার ওপর নির্ভরশীল।

ব্যবসায়ীরা বলছেন, পণ্য আমদানি-রপ্তানির পরিধি বাড়ানো গেলে শুধু বন্দরের ব্যবসাই বাড়বে না, ইতিবাচক প্রভাব পড়বে স্থানীয় অর্থনীতিতেও।

কয়লা ব্যবসায়ী হাসিবুর রহমান বলেন, ইটভাটায় যখন কয়লার চাহিদা থাকে, তখন আমদানি করা যায়। কিন্তু মৌসুম শেষ হয়ে গেলে কয়লা বিক্রি করা কঠিন হয়ে পড়ে। তখন বন্দরে পণ্য পড়ে থাকে, ব্যবসায়ীদের টাকা আটকে যায়। ফলে ঝুঁকি নিয়ে সারা বছর কয়লা আমদানি করা সম্ভব হয় না।

আরেক ব্যবসায়ী মনির হোসেন বলেন, আমরা শুধু কয়লার ওপর নির্ভর করতে চাই না। পাথর, মসলা ও অন্যান্য অনুমোদিত পণ্য আমদানির সুযোগ কাজে লাগাতে চাই। একই সঙ্গে বাংলাদেশের মাছসহ বিভিন্ন পণ্য ভারতে পাঠানোর সুযোগ তৈরি করা গেলে বন্দরের কার্যক্রম সারা বছর চালু রাখা সম্ভব।

হালুয়াঘাট ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি মো. নাদিম আহমেদ বলেন, কয়লার পাশাপাশি পাথর ও মসলাজাতীয় পণ্য আমদানির বিষয়ে ভারতীয় ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আলোচনা চলছে। একই সঙ্গে মাছসহ বিভিন্ন পণ্য ভারতে রপ্তানির পরিকল্পনাও রয়েছে তাদের। দ্রুত আমদানির পাশাপাশি রপ্তানিতেও জোর দেওয়া হচ্ছে বলে জানান তিনি।

গোবরাকুড়া স্থলবন্দরের আমদানি-রপ্তানি গ্রুপের মহাসচিব অশোক কুমার অপু বলেন, গত বছরের ২০ নভেম্বর থেকে দুই বন্দরে আবার কয়লা আমদানি শুরু হয়। চলতি বছরের ১৫ জুন পর্যন্ত প্রায় চার হাজার ট্রাকে ৫২ হাজার টন কয়লা আসে। এরপর আবার আমদানি বন্ধ হয়ে যায়।

তিনি জানান, এর আগে চলতি বছরের ১০ জানুয়ারির পর ভারতীয় কয়লা আমদানি পুরোপুরি বন্ধ ছিল। দীর্ঘ বিরতির পর ২৮ ফেব্রুয়ারি কড়ইতলী দিয়ে ৬১টি এবং গোবরাকুড়া দিয়ে ১৪৩টি ট্রাকে কয়লা আসে। এসব ট্রাকে মোট ২ হাজার ৪২৮ মেট্রিক টন কয়লা ছিল। এতে কয়েক মাস ধরে স্থবির হয়ে থাকা বন্দরে আবার কিছুটা কর্মচাঞ্চল্য ফিরে আসে। এরপর মাঝেমধ্যে কয়লা এসেছে। এভাবে ১৫ জুন পর্যন্ত আমদানি চলে।

অশোক কুমার অপু বলেন, বন্দর চালু রাখার জন্য শুধু আমদানির দিকে তাকিয়ে থাকলে হবে না। আমাদের রপ্তানির বাজারও তৈরি করতে হবে। ফলে সেদিকেই মনোযোগ দিচ্ছি।



কড়ইতলী স্থলবন্দরের আমদানি-রপ্তানি গ্রুপের সভাপতি আবুল কালাম আজাদ বলেন, কয়লা ব্যবসায়ীরা আশানুরূপ লাভ করতে পারেন না। আমদানি করা কয়লার প্রধান ক্রেতা ইটভাটাগুলো। সেখানে চাহিদা কমে গেলে কয়লা অবিক্রীত অবস্থায় পড়ে থাকে। এ কারণে অনেক ব্যবসায়ী আগ্রহ হারাচ্ছেন। আমদানির পাশাপাশি রপ্তানি বাড়ানো গেলে বন্দরের ওপর চাপ কমবে এবং ব্যবসার সুযোগও বাড়বে।

বন্দরের কাস্টমস সুপার মুজাহিদ হোসেন বলেন, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৩ হাজার ৩৩৬টি গাড়িতে প্রায় ৪০ হাজার ৩২ টন কয়লা আমদানি হয়েছে। সাধারণত বছরে চার থেকে ছয় মাস কয়লা আমদানি হয়। ফলে বছরের বড় একটি সময় দুই বন্দরে তেমন কার্যক্রম থাকে না। কয়লার পাশাপাশি অনুমোদিত অন্য পণ্যের আমদানি-রপ্তানি বাড়ানো গেলে ব্যবসার পরিধি বাড়ার পাশাপাশি সরকারের রাজস্বও বাড়বে।

গোবরাকুড়া-কড়ইতলী স্থলবন্দরের ট্রাফিক পরিদর্শক মো. হামিদুর রহমানও মনে করেন, ব্যবসায়ীরা আমদানির পাশাপাশি বিভিন্ন পণ্য ভারতে রপ্তানি করতে পারেন। তার মতে, বন্দরকে সারা বছর সচল রাখতে হলে আমদানি ও রপ্তানি দুই ক্ষেত্রেই কার্যক্রম বাড়াতে হবে।

তবে বন্দরের বর্তমান বাস্তবতা হলো, অবকাঠামো থাকলেও নিয়মিত পণ্য আমদানি-রপ্তানি নেই। ব্যবসায়ী আছেন, কিন্তু সারা বছর বাণিজ্য নেই। আর বাণিজ্য না থাকলে কাজ থাকে না শ্রমিকদেরও।