শিক্ষক দিবস/হুইলচেয়ারে বসেই শিক্ষার আলো ছড়াচ্ছেন আকলিমা

মেহেরপুরের গাংনী উপজেলার রায়পুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের একটি শ্রেণিকক্ষে চলছে ইংরেজি ক্লাস। শিক্ষার্থীদের কেউ বই খুলে মনোযোগ দিয়ে শুনছে, কেউ আবার খাতায় লিখছে। আর হুইলচেয়ারে বসে একের পর শিশুদের পাঠ বুঝিয়ে দিচ্ছেন শিক্ষিকা মোছা. আকলিমা খাতুন।
কখনো হুইলচেয়ার ঠেলে চলে যাচ্ছেন এক বেঞ্চ থেকে আরেক বেঞ্চে। কোনো শিক্ষার্থীর খাতা হাতে নিয়ে দেখছেন বাড়ির কাজ ঠিকমতো করেছে কি না। আবার হুইলচেয়ার ঘুরিয়ে ব্ল্যাকবোর্ডের সামনে গিয়ে লিখে দিচ্ছেন নতুন কোনো শব্দ বা বাক্য। বাইরে থেকে দেখলে হয়তো মনে হবে, এ তো আর দশজন শিক্ষকের মতোই একটি স্বাভাবিক কর্মদিবস। অথচ এই স্বাভাবিকতার পেছনে লুকিয়ে আছে দীর্ঘ লড়াইয়ের গল্প।
মেহেরপুরের গাংনী উপজেলার রায়পুর গ্রামের কৃষক মৃত জোয়াদ আলী মোল্লার কন্যা আকলিমা অনার্স (বাংলা) ১ম বর্ষে পড়ার সময় মেহেরপুর সরকারি কলেজ থেকে বাড়ি ফেরার পথে গাংনীর বাঁশবাড়িয়া নামক স্থানে এক সড়ক দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হন। দুর্ঘটনার পর কোমর থেকে নিচের অংশের স্বাভাবিক চলাচলের ক্ষমতা হারান তিনি। জীবনের গতি যেন হঠাৎ থেমে যায়।
২০০৬ সালের ৫ মার্চ সড়ক দুর্ঘটনায় পতিত হওয়ার পর চিকিৎসার জন্য একের পর এক জায়গায় ছুটেছেন। দীর্ঘ চিকিৎসাতেও কাঙ্ক্ষিত ফল না পেয়ে শেষে তিনি চিকিৎসা নেন বাংলাদেশের পূর্নবাসন কেন্দ্রে (সিআরপি)। সেখানেই বদলাতে শুরু করে তার জীবনের গল্প।
সিআরপির স্বেচ্ছাসেবীদের তত্ত্বাবধানে চিকিৎসা ও কাউন্সেলিংয়ের পাশাপাশি নিজের ভেতরের শক্তিটাও যেন নতুন করে খুঁজে পান আকলিমা। পরিবারের সদস্যরাও সবসময় তার পাশে ছিলেন। শারীরিক সীমাবদ্ধতাকে জীবনের শেষ অধ্যায় হিসেবে না দেখে নতুন করে পথচলার সিদ্ধান্ত নেন তিনি।
এরপর থেকে হুইলচেয়ারই হয়ে ওঠে তার চলার সঙ্গী। কিন্তু থেমে যায়নি আকলিমার স্বপ্ন। পড়াশোনা শেষ করে ২০১০ সালে শিক্ষকতা পেশায় যোগ দেন আকলিমা। কর্মজীবনের শুরুতে ২০১০-২০১৪ সাল পর্যন্ত গাংনী উপজেলার বানিয়াপুকুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেন। পরে ২০১৫ সালে রায়পুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যোগ দিয়ে সেখানেই দীর্ঘদিন ধরে শিশুদের পাঠদান করে আসছেন।
এরই মধ্যে সংসারও পেতেছেন তিনি। তার রয়েছে একটি ছেলে। নাম আদনান মাহমুদ আলী। মায়ের বিদ্যালয়েই দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়ছে সে।
আকলিমার দিন শুরু হয় অন্য অনেক মানুষের মতোই। পার্থক্য শুধু, তাকে প্রতিটি কাজ করতে হয় হুইলচেয়ারে বসে। শ্রেণিকক্ষে যাওয়া, শিক্ষার্থীদের খাতা দেখা, বোর্ডে লেখা, আইসিটির কাজ করা, সবই করেন নিজের মতো করে।

বিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, আকলিমা বিদ্যালয়ের আইসিটিসংক্রান্ত বিভিন্ন কাজের দায়িত্ব পালন করেন। পাশাপাশি ইংরেজি ক্লাসও নেন। প্রয়োজন হলে অন্য শিক্ষকের অনুপস্থিতিতে গণিতসহ অন্যান্য বিষয়ও পড়ান।
রায়পুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা ফৌজিয়ারা খাতুন বলেন, ২০১৯ সালে তিনি বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক হিসেবে যোগ দেওয়ার পর থেকে আকলিমাকে অন্য শিক্ষকদের চেয়ে আলাদাভাবে দেখিনি। শারীরিক প্রতিবন্ধকতা নিয়ে হুইলচেয়ারে বসেও আকলিমা অন্যদের চেয়ে বেশি দায়িত্ব পালন করেন। বিদ্যালয়ের আইসিটিসংক্রান্ত কাজেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। বরং বর্তমানে অন্য অনেক শিক্ষকের তুলনায় আকলিমার ওপরই আমি বেশি নির্ভর করি।
শিক্ষার্থীদের কাছেও আকলিমা শুধু একজন শিক্ষক নন, আপনজনের মতো। পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী জাকিয়া বলে, আমরা আকলিমা ম্যাডামকে আদর করে ‘আকলি ম্যাডাম’ বলে ডাকি। প্রথম শ্রেণি থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত তিনি আমাদের ইংরেজি পড়ান। খুব যত্ন নিয়ে পড়ান বলেও জানায় সে। একই কথা জানায় পঞ্চম শ্রেণির আরেক শিক্ষার্থী আব্দুল জব্বার।
সম্প্রতি বিদ্যালয়ে সরজমিনে যেয়ে দেখা যায়, হুইলচেয়ারে বসেই এক কক্ষ থেকে অন্য কক্ষে যাচ্ছেন আকলিমা। কখনো শিক্ষার্থীদের কাছে গিয়ে খাতা দেখছেন, কখনো ব্ল্যাকবোর্ডে লিখছেন। শারীরিক সীমাবদ্ধতা তার চলার গতি কমিয়েছে, কিন্তু দায়িত্ব পালনে যেন কোনো ঘাটতি রাখেনি।
আকলিমার গল্প তাই শুধু একজন প্রতিবন্ধী শিক্ষকের গল্প নয়। এটি পড়ে গিয়ে আবার উঠে দাঁড়ানোর গল্প। এটি এমন এক নারীর গল্প, যিনি শরীরের একটি অংশের সক্ষমতা হারিয়েও নিজের স্বপ্ন হারাননি।
আকলিমা খাতুন এশিয়া পোস্টকে বলেন, দুর্ঘটনার পর জীবনটা অনেক কঠিন হয়ে গিয়েছিল। দীর্ঘদিন চিকিৎসা নিয়েও যখন হাঁটতে পারিনি, তখন অনেকবার ভেঙে পড়েছি। কিন্তু পরিবার, সিআরপির সহযোগিতা আর নিজের ইচ্ছাশক্তি আমাকে আবার ঘুরে দাঁড়ানোর সাহস দিয়েছে।
তিনি আরও বলেন, আজ হুইলচেয়ারে বসেই আমি শিশুদের পড়াই, নিজের দায়িত্ব পালন করি। আমার শিক্ষার্থীদের ভালোবাসাই আমার সবচেয়ে বড় শক্তি। আমি কারও ওপর নির্ভরশীল হতে চাই না। নিজের কাজ নিজে করে যেতে চাই। আর আমার স্বপ্ন, আমার ছেলে ও আমার শিক্ষার্থীদের ভালো মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা।
জীবন তাকে থামিয়ে দেওয়ার অনেক কারণ দেখিয়েছিল। আকলিমা বেছে নিয়েছেন এগিয়ে যাওয়ার পথ। আজ রায়পুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষে হুইলচেয়ারে বসা এই শিক্ষকই যেন প্রতিদিন তার শিক্ষার্থীদের একটি নীরব শিক্ষা দেন, শরীরের কোনো সীমাবদ্ধতা স্বপ্ন দেখার ক্ষমতাকে থামিয়ে দিতে পারে না।
